হুমায়ুন আহমেদকে খুব মনে পড়ে!

হুমায়ুন আহমেদকে খুব মনে পড়ে!

সৈয়দ আবদাল আহমদ :   “কী নাম তোমার খোকা?  কাজল।
কী সুন্দর নাম! কাজল। তোমাকে মাখতে হয় চোখে। তা-ই না? কিছু না-বুঝেই মাথা নাড়লাম।”
শিশু বয়সে সিলেটের মীরাবাজারে গাছগাছালি ভরা এক বাড়িতে ঢুকে শুক্লাদির সঙ্গে এভাবেই পরিচিত হয়েছিলেন হুমায়ুন আহমেদ।
প্রিয় হুমায়ুন আহমেদ আপনাকে খুব মনে পড়ে! ১৯ জুলাই দিনটি আমাদের জন্য বেদনার। সাত বছর আগের এ দিনটিতে আপনি আমাদের মাঝ থেকে চিরবিদায় নিয়েছিলেন।
অষ্টম প্রয়ান দিবস পালনের এ মুহূর্তে আপনার এমন কত কথাই না মনে পড়ছে! পড়বেই না কেন? শুধু কি শুক্লাদি? মনে রাখার মতো হাজারটা উপকরণ আপনি রেখে গেছেন। কখনো কি এগুলো ভোলা যায়? না, যায় না। আপনি ছিলেন কথার জাদুকর। মজার মজার গল্প,উপন্যাস, রূপকথা, স্মৃতিকথা, সায়েন্স ফিকশন,সিনেমা, ভ্রমন কাহিনি, আত্মজীবনী,গান –কী নেই, যা আপনি লিখে যাননি!
আড্ডার মজলিসে আপনি থাকতেন মধ্যমণি। আপনার কৌতুক, আপনার রসবোধ এতটাই মজাদার ছিল যে,হাসতে হাসতে পেট ফেটে যাওয়ার উপক্রম হতো।
আপনার সাহচর্যে যারাই গেছে, তাদেরই আছে এমন অভিজ্ঞতা। আপনার ছিল বিচিত্র সব সখ। ছেলেবেলার সোনাঝরা স্মৃতি কত মধুর করে বলে গেছেন আপনি। আহ,কী মজা!
বাবার কথাই শুনি আপনার মুখ থেকে।
“বাবার খুব সখ ছিল প্রথম সন্তানটি হবে মেয়ে। তিনি মেয়ের নাম ঠিক করে বসে আছেন। একগাদা মেয়েদের ফ্রক বানিয়েছেন। রূপার মল বানিয়েছেন। তাঁর মেয়ে মল পায়ে দিয়ে ঝমঝম করে হাঁটবে- তিনি মুগ্ধ হয়ে দেখবেন। ছেলে হওয়ায় সব পরিকল্পনা মাঠে মারা গেল।
এইসব মেয়েলি পোশাক আমাকে দীর্ঘদিন পরতে হয়। বাবাকে সন্তুষ্ট করার জন্য মা আমার মাথার চুলও লম্বা রেখে দেন। সেই বেণী-করা চুলে রংবেরঙের রিবন পরে আমার শৈশবের শুরু।”
কাজল নামটা কীভাবে হলো সেটাও খুব মজার। হুমায়ুন আহমেদ আপনি লিখেছেন,” আমার মায়ের দ্বিতীয়বার টাইফয়েড হওয়ায় বাবা স্ত্রীর মৃত্যুর জন্য মানসিক প্রস্তুতি গ্রহন করলেন। সেই প্রস্তুতির প্রমান হচ্ছে আমার নামকরণ।
আমার নাম রাখলেন কাজল। বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালির অপুর স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছিল। অপুর ছেলের নাম ছিল কাজল। আমার ভালো নাম রাখা হলো শামসুর রহমান। বাবার নাম ফয়জুর রহমান। বাবার নামের সঙ্গে মিলিয়ে ছেলের নাম।
ছয় বছর পর্যন্ত আমাকে শামসুর রহমান নাম নিয়ে চলাফেরা করতে হল। সপ্তম বছরে বাবা হঠাৎ সেই নাম বদলে রাখলেন হুমায়ুন আহমেদ। বছর দুই হুমায়ুন আহমেদ চলার পর আবার নাম বদলে দেবার ব্যবস্হা হল। আমি কঠিন আপত্তি জানালাম। বারবার নাম বদলানো চলবে না।”
এবার শুক্লাদির কথা। হুমায়ুন আহমেদ লিখলেন,”নাম বলা এবং মাথা নাড়াবার পর আমি চুপ করে রইলাম। শুক্লাদি বললেন,কীজন্যে এসেছ এ-বাড়িতে? বেড়াতে। ও আচ্ছা –বেড়াতে? তুমি তাহলে অতিথি। অতিথি নারায়ণ। তা-ই না? আবারও না বুঝে মাথা নাড়ালাম।”
হুমায়ুন আহমেদ আমাদের খুব মনে পড়ছে এসব মজার কথা। শুক্লাদি ঘরে গিয়ে আপনাকে কদমফুলের মতো একটা মিষ্টি এনে দিলেন। মিষ্টি খেতে খেতে আপনি বাড়ি চলে গেলেন। দ্বিতীয় দিনে আবার গেলেন ওই বাড়িতে মিষ্টির আশায়। শুক্লাদি মিষ্টি দিলেন।
সৌভাগ্য ভাগ করে উপভোগ করতে তৃতীয় দিনে আপনি ছোট বোন শেফুকে নিয়ে গেলেন। কিন্তু ওইদিন শুক্লাদির ঘরে মিষ্টি ছিল না। তিনি আপনার হাতে তুলে দিলেন অসম্ভব সুন্দর এক বই–‘ক্ষীরের পুতুল’।
লেখক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বইটিতে লিখে দিলেন,”দুজন দেবশিশুকে ভালোবাসা ও আদরে – শুক্লাদি”। এই বই-ই ছিল আপনার স্বপ্নলোকের চাবি। এই বই খুলে দেয় আপনার স্বপ্নজগতের দরজা।
বদলে দেয় আপনার জীবন। বই পড়ার আনন্দে আপনি হন বিভোর। বই এবং বই-ই হয় আপনার নিত্যসঙ্গী। ভবিষ্যতে আপনি যে একজন বড় লেখক হয়ে উঠবেন, সেই সত্বাটি তখনই আপনার মধ্যে জন্ম নেয়।
হুমায়ুন আহমেদের প্রথম প্রকাশিত বই ‘নন্দিত নরকে’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রসায়ন বিভাগের ছাত্র হিসেবে মোহসীন হলে থাকাকালে ১৯৭০ সালে এটি লিখেন। মাসিক ‘মুখপত্রে’ প্রথম ছাপা হয়। ১৯৭২ সালে দ্বিতীয়বার ছাপা হয় দৈনিক বাংলায়।
বাংলা বিভাগের দিকপাল অধ্যাপক ড.আহমদ শরীফ মুখপত্রে ‘নন্দিত নরকে’ নাম দেখেই আকৃষ্ট হন। ১৯৭২ সালে হুমায়ুন আহমেদের বন্ধু আহমদ ছফার আগ্রহে খান ব্রাদারস থেকে প্রথম বই আকারে বের হয়।
দাম ছিল সাড়ে তিন টাকা। বইটি ভূমিকা ড.আহমদ শরীফ নিজেই উৎসাহিত হয়ে লিখে দেন। ১৯৭২ সালের ১৬ জুন তিনি লিখেন,” গল্পের নাম ‘নন্দিত নরকে’ দেখেই আকৃষ্ট হই। লেখক তো বটেই, তাঁর নামটিও ছিল আমার অপরিচিত। তবুও পড়তে শুরু করলাম ওই নামের মোহেই। পড়ে অভিভূত হলাম।
গল্পে সবিষ্ময়ে প্রত্যক্ষ করেছি একজন সুক্ষ্মদরশী শিল্পীর,একজন কুশলী স্রষ্টার পাকা হাত। বাঙলা সাহিত্যক্ষেত্রে এক সুনিপুণ শিল্পীর,এক দক্ষ রূপকারের প্রজ্ঞাবা দ্রষ্টার জন্মলগ্ন যেনো অনুভব করলাম।

হুমায়ুন আহমেদ বয়সে তরুণ, মনে প্রাচীন দ্রষ্টা,মেজাজে জীবন রসিক,স্বভাবে রূপদর্শী, যোগ্যতায় দক্ষ রূপকার। ভবিষ্যতে তিনি বিশিষ্ট জীবনশিল্পী হবেন — এই বিশ্বাস ও প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করবো।”
ড. আহমদ শরীফের প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলেছে। তিনি জীবন শিল্পী তো বটেই, হলেন বাংলাদেশের কিংবদন্তিতুল্য লেখক। বিংশ শতাব্দীর বাঙালি কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম তিনি। সংলাপ প্রধান শৈলীর জনক। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তিন শতাধিক।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাষায়, “হুমায়ুন আহমেদ একটি শতাব্দীর সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। তিনি সাহিত্যে নতুন যুগের সৃষ্টি করেছেন। তিনি শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের চেয়েও জনপ্রিয় লেখক”। হুমায়ুন আহমেদ মধ্যবিত্ত জীবনের সুখদুঃখ হাসিকান্নার গল্প অত্যন্ত সাবলীলভাবে তুলে এনেছেন।
শঙ্খনীল কারাগার তাঁর প্রথম লেখা হলেও ছাপা হয় নন্দিত নরকের ছয়মাস পর ১৯৭২ সালেই। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তিনি নাটককে জনপ্রিয় করেন। সিরিজ নাটক এইসব দিনরাত্রি দিয়ে শুরু। এরপর বহুব্রীহি, অয়োময়,কোথাও কেউ নেই, নক্ষত্রের রাত।
হিমু, মিসির আলি, শুভ্র, বাকের ভাই তাঁর গল্পের আকর্ষণীয় চরিত্র। তরুণদের এসব চরিত্র খুবই আকৃষ্ট করে। হলুদ জামার হিমুকে কে না চেনে?
হুমায়ুন আহমেদের বড় সাফল্য তিনি বাংলাদেশে একটা বিশাল পাঠক সমাজ তৈরি করেছেন। তিনি তরুণদের বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলেছেন। আর একটা বিষয় তাঁর বইয়ের কারনে পশ্চিম বঙ্গের বই আসার জোয়ার বন্ধ হয়েছে।
আমার ভালো লাগছে এতবড় একজন লেখকের সান্নিধ্য আমিও পেয়েছি। তাঁকে প্রথম দেখি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রসায়ন বিভাগে ড. এস জেড হায়দার স্যারের কক্ষে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় রসায়ন বিভাগের ড.শফিউল্লাহ স্যারের একটি চিঠি পৌঁছাতে ওখানে এসেছিলাম। হুমায়ুন আহমেদ রসায়ন বিভাগের তখন শিক্ষক। আমি তাঁর সাথে পরিচিত হই।
তিনি পলিমার কেমিস্ট্রিতে তাঁর পিএইচডি করেন আমেরিকায়। তবে লেখক হিসেবে তাঁকে তখনও চিনতাম না। দৈনিক বাংলা ও বিচিত্রা অফিসে তিনি প্রায়ই আসতেন। দৈনিক বাংলার ফিচার সম্পাদক সালেহ চৌধুরী ও কবি হাসান হাফিজের সঙ্গে তাঁর খুব বন্ধুত্ব ছিল। সালেহ ভাইকে তিনি খুব সমীহ করতেন।
দৈনিক বাংলায় তাঁর ‘দূরে কোথাও’ নামে একটি ধারাবাহিক উপন্যাস বের হতো। আমি রসায়নের ছাত্র হওয়ার হুমায়ুন ভাই আমাকে স্নেহ করতেন। ফিলিপস পুরস্কার পাওয়ার পর অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।
আমার সঙ্গে ছবি তুলে রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘একজন সেলিব্রিটির সঙ্গে ছবি তোলার মজাই আলাদা।’ এরপর সালেহ ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর কাছে কয়েকবারই আড্ডায় গেছি। প্রধানমন্ত্রীর অফিসে তিনি গিয়েছিলেন। সেখানেও আছে তাঁর সঙ্গে আমার মজার স্মৃতি।
আগুনের পরশমণি ছবিটি মধুমিতা সিনেমা হলে নাইট’শোতে একসঙ্গে বসে দেখেছিলাম। আমার স্ত্রী এবং হুমায়ুন আহমেদের পরিবারও উপস্থিত ছিলেন। ছবিটি সম্পর্কে আমার মন্তব্যে হুমায়ুন ভাই খুব খুশী হয়েছিলেন।
বৃষ্টি, জোছনা, নিসর্গ এবং সমুদ্র হুমায়ুন আহমেদের ভালোলাগার বিষয়। গাজীপুরে তিনি নুহাশ পল্লী গড়ে তুলেন। এই নুহাশ পল্লীতে নিসর্গের মাঝে প্রায়ই তিনি বৃষ্টি আর জোসনা উপভোগ করতেন। বৃষ্টি বিলাস নামে একটি ঘর সেখানে আছে। সেন্টমার্টিনে তিনি সমুদ্র বিলাস নামে একটি বাড়ি ছিল তাঁর। জোছনা উপভোগ করতে একবার তিনি সুনামগঞ্জ গিয়েছিলেন।
জোছনা ও বৃষ্টি সম্পর্কে তিনি লিখেন,”কোনো কোনো রাতে অপূর্ব জোছনা হয়। সারা ঘন নরম আলোয় ভাসতে থাকে। ভাবি একা একা বেড়ালে ভালো হতো। জোছনা দেখতে দেখতে আমার হঠাৎ মনে হলো প্রকৃতির কাছে কিছু চাইতে নেই, কারন প্রকৃতি মানুষের কোনো ইচ্ছাই অপূর্ণ রাখে না।
মাঝে মাঝে বৃষ্টি নামে। কান্নার সুরের মতো সে শব্দ। আমি কান পেতে শুনি। বাতাসে জাম গাছের পাতার শব্দ হয়। সব মিলিয়ে হ্নদয় হা হা করে উঠে। “
হাছন রাজা ও লালন শাহ’র ভক্ত ছিলেন তিনি। তাঁর নাটক সিনেমায় তাঁদের গান ব্যবহার করেছেন। নিজেও গান লিখেছেন। নিজের পছন্দের বেশ কয়েকটি গান আছে। যেমন– একটা ছিল সোনার কন্যা, আমার আছে জল,মরিলে কান্দিস আমার দায়,আমার উড়াল পঙীরে, চাঁদনি পসর রাতে ইত্যাদি।
হুমায়ুন আহমেদ তিনশোর বেশি বই লিখেছেন। বেশিরভাগ পাঠকেরই বইগুলোর নাম জানা। বাংলা একাডেমীর বইমেলায় এখনও তাঁর বই-ই একচেটিয়া বিক্রি হয়। তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে এখন গবেষণা হচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে হুমায়ুন আহমেদের দেশপ্রেম নিয়ে পিএইচডি করেছেন সানজিদা ইসলাম। মুক্তিযুদ্ধের ওপর হুমায়ুনের ৯টি উপন্যাস ও ৯টি গল্পকে ঘিরেই এই গবেষণা।
এরমধ্যে জোছনা ও জননীর গল্প, অনীল বাগচীর একদিন, ১৯৭১, শ্যামল ছায়া তো আমার কাছে অনন্য প্রথম আলোকে বললেন, কিশোরগঞ্জের মেয়ে সানজিদা ইসলাম। ড. খালেদ হোসাইন এ গবেষণা তত্ত্বাবধান করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় হুমায়ুন আহমেদ বন্দিশিবিরে ছিলেন। অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। তবে তাঁর বাবা পাকিস্তানীদের হাতে শহীদ হন।
হুমায়ুন আহমেদের জীবনের শেষ দিনগুলো কাটে নিউইয়র্কে কোলন ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য। নিউইয়র্কের বেলেভ্যু হাসপাতালে তিনি মারা যান। তাঁর ইচ্ছা ছিল নবীজির ( সা.) জীবনীগ্রন্থ লিখবেন। চমৎকারভাবে শুরুও করেছিলেন। কিন্তু শেষ করতে পারেননি।
তিনি ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর জন্মে ছিলেন নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে। তিনি এখন নুহাশ পল্লীতে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। তার মৃত্যু দিবসে তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি গান মনে পড়ছে—
“তবু মনে রেখো
যদি দূরে যাই চলে
তবু মনে রেখো– “
প্রিয় হুমায়ুন আহমেদ, আমরা সবসময় আপনাকে মনে রাখবো। কখনো ভুলবো না। আপনাকে ভোলা যায় না।
লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, abdal62@gmail.com