সংকটাপন্ন প্রবাসীদের কর্মসংস্থান জরুরি

সংকটাপন্ন প্রবাসীদের কর্মসংস্থান জরুরি

                                                                                  সম্পাদকীয়                                       

করোনা মহামারীতে বিপর্যস্ত হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন অনেক প্রবাসী। এর মধ্যে কর্মস্থল থেকে দেশে ফিরতে বলায় বাধ্য হয়ে ফিরেছেন ২৯ শতাংশ প্রবাসী। কোভিড-১৯-এর প্রভাবে অভিবাসী কর্মীদের সুনির্দিষ্টভাবে বিপদাপন্নতা তৈরি হয়েছে।
করোনা মহামারীর কারণে উপার্জনব্যবস্থা, সামাজিক সেবা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সহায়তার নেটওয়ার্কের অভাবে হাজারো অভিবাসী কর্মী প্রবাসে যে দেশে কাজ করছিলেন, সেখান থেকে বাংলাদেশে তাদের জেলায় ফিরে আসতে বাধ্য হন। কর্মস্থলে তথ্য ও স্বাস্থ্যসেবা পেতে নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন ৬৪ শতাংশ প্রবাসী। দেশে ফিরে কোনো কাজ পাচ্ছেন না তারা। তাদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোও বিপদে। দেশে ফেরা ৭০ শতাংশ প্রবাসী বাংলাদেশি জীবিকাহীন হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে প্রবাসীদের ৫৫ শতাংশ জানান, তাদের ওপর ঋণের বোঝা রয়েছে।তাদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ পরিবার ও বন্ধুর কাছে ঋণগ্রস্ত, ৪৪ শতাংশ ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান (এমএফআই), স্বনির্ভর দল এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণগ্রস্ত। এমএফআই, এনজিও এবং বেসরকারি ব্যাংক থেকে গৃহীত ৬৫ শতাংশকে ঋণের জন্য সুদ বহন করতে হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। মহাজন বা সুদে টাকা ধার দেনÑএমন ব্যক্তিদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের ক্ষেত্রে ৬২ শতাংশ ঋণগ্রহীতাকে সুদ গুনতে হচ্ছে ৫০ থেকে ১৫০ শতাংশ। চলতি বছরের ফেব্রæয়ারি থেকে জুনের মধ্যে যারা দেশে ফিরেছেন, তারা চরম আর্থিক সংকটে ভুগছেন।
এ ছাড়া স্বাস্থ্যসহ নানা সমস্যাও রয়েছে। বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের প্রভাব অভিবাসী কর্মীদের সুনির্দিষ্টভাবে আরও বিপদাপন্ন করেছে। বাংলাদেশের ১২ জেলায় বিদেশফেরত ব্যক্তিদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) পরিচালিত ‘র্যা পিড অ্যাসেসমেন্ট অব নিডস অ্যান্ড ভালনারেবিলিটিস অব ইন্টার্নাল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল রিটার্ন মাইগ্র্যান্টস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এ গবেষণাটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে ‘রিজিওনাল এভিডেন্স ফর মাইগ্রেশন অ্যানালাইসিস অ্যান্ড পলিসি (রিমেপ)’- প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত হয়েছে। আইওএম এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে মোট ১ হাজার ৪৮৬ জন বিদেশফেরত ব্যক্তির ওপর চালানো জরিপের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। আইওএম জানায়, ২০২০ সালের মে এবং জুলাই মাসে দেশের ১২টি উচ্চ অভিবাসনপ্রবণ জেলায় এ জরিপ পরিচালনা করা হয়, যার মধ্যে সাতটি জেলায় ভারতের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে।মোট ৬৪ শতাংশ আন্তর্জাতিক অভিবাসী উল্লেখ করেন, করোনার প্রাদুর্ভাবে তাদের কর্মস্থল দেশে তথ্য এবং স্বাস্থ্যসেবা পেতে তাদের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ২৯ শতাংশ বলেছেন, যে দেশে তারা ছিলেন সেই দেশ ত্যাগ করতে বলায় তারা ফেরত এসেছেন। ২৩ শতাংশ জানান, তারা করোনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন এবং পরিবারের কাছে ফেরত আসতে চেয়েছেন।২৬ শতাংশ জানান, তাদের পরিবার তাদের ফেরত আসতে বলায় ফিরে এসেছেন। আইওএম বাংলাদেশের মিশন প্রধান গিওরগি গিগাওরি জানান, সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৭৫ শতাংশ জানান, তারা আবার অভিবাসনে আগ্রহী। তাদের মধ্যে ৯৭ শতাংশই করোনা প্রাদুর্ভাবের আগে যে দেশে কাজ করতেন, সে দেশেই আবার যেতে চান। অন্যদিকে ৬০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী আরও ভালো বেতনের চাকরি নিশ্চিতে তাদের দক্ষতা বাড়াতে আগ্রহী। কিন্তু বর্তমানে যে সংকটে তারা আছেন সেটা অবর্ণনীয়। আত্মীয়-স্বজন -বন্ধু-বান্ধবের ঋণের চাপ থেকে মুক্ত হতে এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সরকারের হস্তক্ষেপ জরুরি। এদের পুনর্বাসন করে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে এমন প্রত্যাশা আমাদের।